প্রাথমিক চিকিৎসা

হার্ট অ্যাটাক হলে কী করবেন? অ্যাম্বুলেন্স আসার আগে করণীয়

৫ নভেম্বর, ২০২৬ · পড়তে ~৬ মিনিট

♥হার্ট অ্যাটাক হলে এখনই কী করবেন?
জরুরি নম্বর999

দেরি না করে জরুরি সাহায্য চান।

  1. ৯৯৯-এ কল করে অ্যাম্বুলেন্স চান।
  2. রোগীকে আরামদায়ক অবস্থায় বিশ্রামে রাখুন।
  3. রোগীর সচেতনতা ও শ্বাস পর্যবেক্ষণ করুন।
  4. অচেতন এবং স্বাভাবিক শ্বাস না থাকলে CPR শুরু করুন।
☎ এখনই ৯৯৯-এ কল করুনজরুরি পরিস্থিতিতে চিকিৎসাকর্মীর নির্দেশনা অনুসরণ করুন।

হার্ট অ্যাটাক এমন একটি জরুরি অবস্থা, যেখানে প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ কারও বুকে চাপ বা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম কিংবা অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দিলে বিষয়টিকে অবহেলা করা উচিত নয়। অনেক সময় মানুষ বুঝতে পারেন না কী হচ্ছে, আবার আশেপাশের লোকজনও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

এমন পরিস্থিতিতে প্রথম কাজ হলো দ্রুত জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। চিকিৎসক বা অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত কিছু সঠিক পদক্ষেপ রোগীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

এই লেখায় জানবেন, হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাব্য লক্ষণ কী, এমন পরিস্থিতিতে প্রথমে কী করবেন এবং সাহায্য আসা পর্যন্ত রোগীর পাশে থেকে কীভাবে সহযোগিতা করবেন।

জরুরি সতর্কতা: কারও হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে বলে সন্দেহ হলে এখনই বাংলাদেশে ৯৯৯ নম্বরে কল করুন অথবা জরুরি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করুন। এই লেখাটি পড়া বা লক্ষণ নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় সাহায্য চাইতে দেরি করবেন না।

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ কী কী?

হার্ট অ্যাটাকের সময় সবার একই রকম লক্ষণ দেখা যায় না। কারও তীব্র বুকে ব্যথা হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট, বমি ভাব বা অস্বাভাবিক ক্লান্তিই প্রধান লক্ষণ হতে পারে। সাধারণ কিছু লক্ষণ হলো:

  • বুকে চাপ বা ব্যথা: বুকের মাঝখানে চাপ, ভারী অনুভূতি, চেপে ধরা বা জ্বালাপোড়ার মতো অস্বস্তি।
  • ব্যথা অন্যদিকে ছড়িয়ে পড়া: বুক থেকে এক বা দুই হাত, কাঁধ, পিঠ, ঘাড়, চোয়াল বা পেটের দিকে ব্যথা ছড়াতে পারে।
  • শ্বাসকষ্ট: বিশ্রামে থাকা অবস্থাতেও শ্বাস নিতে কষ্ট হতে পারে।
  • অতিরিক্ত ঘাম: কোনো পরিশ্রম ছাড়াই ঠান্ডা ঘাম হতে পারে।
  • বমি ভাব বা মাথা ঘোরা: বমি বমি ভাব, বমি, মাথা হালকা লাগা বা দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।
  • অস্বাভাবিক ক্লান্তি: বিশেষ করে নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা দুর্বলতা দেখা যেতে পারে।

মনে রাখবেন, বুকের ব্যথা না থাকলেও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। লক্ষণ দেখে নিজে নিশ্চিতভাবে রোগ নির্ণয় করার চেষ্টা করবেন না।

কারও হার্ট অ্যাটাক হলে প্রথমে কী করবেন?

১. দ্রুত জরুরি সাহায্য চান

হার্ট অ্যাটাক সন্দেহ হলে প্রথমেই বাংলাদেশে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করুন এবং অ্যাম্বুলেন্সের সাহায্য চান। প্রয়োজনে নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন। ফোনে সংক্ষেপে জানান:

  • রোগীর কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে।
  • রোগী সচেতন আছেন কি না এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিচ্ছেন কি না।
  • রোগী কোথায় আছেন: সম্পূর্ণ ঠিকানা ও কাছের পরিচিত স্থান।
  • যোগাযোগের জন্য আপনার ফোন নম্বর।

রোগীর অবস্থা খারাপ হলে বা পরিবর্তন হলে জরুরি সেবা প্রদানকারীকে আবার জানান।

২. রোগীকে বিশ্রামে রাখুন

রোগীকে হাঁটাচলা বা কোনো ধরনের শারীরিক পরিশ্রম করতে দেবেন না। আরামদায়কভাবে বসতে বা আধশোয়া অবস্থায় থাকতে সাহায্য করুন। রোগী যে অবস্থায় সবচেয়ে স্বস্তি বোধ করেন, সেই অবস্থায় থাকতে দিন। অপ্রয়োজনীয়ভাবে নাড়াচাড়া করবেন না।

৩. আঁটসাঁট পোশাক ঢিলা করে দিন

গলার টাই, কলার, বেল্ট বা আঁটসাঁট পোশাক ঢিলা করে দিন, যাতে রোগী স্বস্তিতে থাকতে পারেন। ঘরের পরিবেশ শান্ত রাখুন এবং রোগীকে আতঙ্কিত না করার চেষ্টা করুন।

৪. রোগীকে একা রাখবেন না

অ্যাম্বুলেন্স আসা পর্যন্ত রোগীর পাশে থাকুন। তিনি সচেতন আছেন কি না এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিচ্ছেন কি না, খেয়াল করুন। রোগীকে আশ্বস্ত করুন এবং অপ্রয়োজনীয় লোকজনের ভিড় এড়িয়ে চলুন।

৫. ওষুধ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন

হার্ট অ্যাটাক সন্দেহ হলেই নিজের সিদ্ধান্তে যেকোনো ওষুধ খাওয়ানো ঠিক নয়।

অ্যাসপিরিন সম্পর্কে জরুরি চিকিৎসা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, জরুরি সেবায় কল করার পর সচেতন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির বুকে ব্যথার মতো উপসর্গ থাকলে এবং অ্যাসপিরিনে অ্যালার্জি না থাকলে, আগে থেকে চিকিৎসকের নিষেধ না থাকলে, ১৬২–৩২৫ মিলিগ্রাম অ্যাসপিরিন চিবিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে।

তবে রোগীর অ্যালার্জি, পূর্বের চিকিৎসা-নিষেধ বা অন্য কোনো ঝুঁকি জানা না থাকলে নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নেবেন না। জরুরি কলের অপারেটর বা চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করুন। অ্যাসপিরিন দেওয়ার জন্য কখনোই জরুরি সাহায্য চাইতে দেরি করবেন না। রোগীর আগে থেকে প্রেসক্রাইব করা জরুরি ওষুধ থাকলে সেটি ব্যবহারের বিষয়ে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।

রোগী অজ্ঞান হয়ে গেলে বা শ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে কী করবেন?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝতে হবে। হার্ট অ্যাটাক হলে হৃদপিণ্ডে রক্ত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে হৃদপিণ্ড কার্যকরভাবে রক্ত পাম্প করা বন্ধ করে দেয়। হার্ট অ্যাটাক থেকে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হতে পারে, তবে দুটি একই অবস্থা নয়।

রোগী হঠাৎ অচেতন হয়ে গেলে এবং স্বাভাবিকভাবে শ্বাস না নিলে, অথবা শুধু হাঁপানোর মতো অস্বাভাবিক শ্বাস নিতে থাকলে, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছে বলে ধরে নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিন।

  1. জরুরি সেবায় কল করুন এবং আশেপাশের কাউকে AED (Automated External Defibrillator) থাকলে নিয়ে আসতে বলুন।
  2. রোগীকে শক্ত ও সমতল জায়গায় চিত করে শুইয়ে দিন।
  3. বুকের মাঝখানে, বুকের হাড়ের নিচের অর্ধেক অংশে এক হাতের তালুর গোড়া রাখুন। অন্য হাতটি তার ওপর রাখুন।
  4. দুই হাত সোজা রেখে বুকের ওপর জোরে ও দ্রুত চাপ দিন। একজন প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে মিনিটে ১০০–১২০ বার এবং প্রায় ৫–৬ সেন্টিমিটার গভীরতায় চাপ দেওয়ার লক্ষ্য রাখুন।
  5. প্রতিবার চাপ দেওয়ার পর বুককে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে দিন। অপ্রয়োজনীয় বিরতি দেবেন না।
  6. AED পাওয়া গেলে সেটির নির্দেশনা অনুসরণ করুন।

আপনি CPR-এ প্রশিক্ষিত না হলেও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি হঠাৎ অচেতন হয়ে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস না নিলে বুকের ওপর চাপ দেওয়া শুরু করুন। জরুরি কলের অপারেটর আপনাকে নির্দেশনা দিতে পারেন।

গুরুত্বপূর্ণ: রোগী অচেতন কিন্তু স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিচ্ছেন, এমন হলে বুক চাপ দেবেন না। জরুরি সেবার নির্দেশনা অনুসরণ করুন এবং শ্বাস-প্রশ্বাস পর্যবেক্ষণ করুন।

অ্যাম্বুলেন্স আসার আগে কী কী প্রস্তুত রাখবেন?

অ্যাম্বুলেন্স বা চিকিৎসাকর্মীরা পৌঁছালে দ্রুত তথ্য দিতে পারলে রোগীর চিকিৎসা শুরু করতে সুবিধা হয়। সম্ভব হলে নিচের বিষয়গুলো প্রস্তুত রাখুন:

  • রোগীর নাম ও বয়স।
  • কখন থেকে বুকে ব্যথা বা অন্যান্য উপসর্গ শুরু হয়েছে।
  • রোগীর আগে থেকে হার্টের রোগ, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ আছে কি না।
  • রোগী নিয়মিত কী কী ওষুধ খান।
  • কোনো ওষুধে অ্যালার্জি আছে কি না।
  • আগে হাসপাতালে ভর্তি বা হার্টের কোনো চিকিৎসা নেওয়ার ইতিহাস আছে কি না।

এগুলো সংগ্রহ করতে গিয়ে রোগীকে একা ফেলে রাখবেন না বা জরুরি সাহায্য আসতে দেরি করবেন না।

হার্ট অ্যাটাক সন্দেহ হলে যেসব ভুল করবেন না

আতঙ্কের সময় অনেকেই এমন কিছু কাজ করেন, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করতে পারে।

  • রোগীকে হাঁটিয়ে বা সিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করবেন না।
  • রোগীকে নিজে গাড়ি বা মোটরসাইকেল চালাতে দেবেন না।
  • চিকিৎসকের নির্দেশনা ছাড়া একাধিক ওষুধ খাওয়াবেন না।
  • রোগীকে খাবার বা পানি খেতে জোর করবেন না।
  • বুকের ব্যথা নিজে থেকেই কমে যাবে ভেবে অপেক্ষা করবেন না।
  • রোগী অচেতন ও স্বাভাবিকভাবে শ্বাস না নিলে শুধু মুখে পানি ছিটিয়ে বা বাতাস করে সময় নষ্ট করবেন না।

শেষ কথা

হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে দ্রুত সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে জরুরি সাহায্য চান, রোগীকে বিশ্রামে রাখুন এবং অ্যাম্বুলেন্স বা চিকিৎসাকর্মী আসা পর্যন্ত তার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করুন। রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সের প্রয়োজন হলে রোগীর অবস্থা অনুযায়ী উপযুক্ত পরিবহনের ব্যবস্থা করুন।

মনে রাখবেন: হার্ট অ্যাটাক সন্দেহ হলে অপেক্ষা নয়, দ্রুত জরুরি সাহায্য নিন।

তথ্যসূত্র: American Heart Association ও American Red Cross, “2020 Focused Update for First Aid”, Circulation 2020;142:e287–e303 (বুকে ব্যথায় জরুরি সেবায় কল করার পর অ্যাসপিরিন চিবিয়ে খাওয়ার নির্দেশনা)।

স্বাস্থ্যবিষয়ক সতর্কতা: এই নিবন্ধটি সাধারণ সচেতনতামূলক তথ্যের জন্য। এটি চিকিৎসকের পরামর্শ, রোগ নির্ণয় বা CPR প্রশিক্ষণের বিকল্প নয়। জরুরি অবস্থায় ৯৯৯ বা চিকিৎসাকর্মীর নির্দেশনা অনুসরণ করুন।

অ্যাম্বুলেন্স দরকার?

কল করে প্রয়োজন জানান। ভাড়া নিশ্চিত করে তবেই গাড়ি পাঠানো হয়।

কল করুনWhatsApp